গ্রিক দেবী, শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া

প্রথমে ভেবেছিলাম লেখার শিরোনাম দেব, ‘অন্তত খালেদা ভোল পাল্টান না’। কিন্তু পরে ভাবলাম বড্ড এক পেশে হয়ে যায়, আমাদের তো আবার জোর করেই শেখানো হয়েছে ব্যালেন্স প্রতিবেদন বা মন্তব্য প্রতিবেদন করতে। যেখানে স্পষ্ট ‘কালো’ দেখার পরও ব্যালেন্স করে বলতে হয়, ‘আগের সাদা অংশটি আপাতত এখন ধুষর’ বা এই জাতীয় কিছু কথা। তাও সেটা ছাপা হবে কি হবে না সেটা নিয়ে যাতনা তো থাকেই। তাই একটু ঘুরিয়ে বলছি। গ্রিক দেবী, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আর খালেদা জিয়া।

ক্ষনে ক্ষনে যেহেতু আমাদের জাতীয় ইস্যুর পরিবর্তন হচ্ছে তাই কোনটা রেখে কোনটা আলোচনা করাটা সময়ের দাবী সেটা নির্বাচনে কিছুটা হিমসিম খেতে হয়। ভারত সফরে ‘কুছ তো মিলা’র যে বিষয়টি আসলে কতটা বিফল সফরের শামিল সেটা নিয়ে কথা বলা দরকার ছিল। বেগম জিয়ার দেশ বিক্রির ফর্মুলা এখনো  চালিয়ে যাচ্ছেন, যেটা এই দ্বাদবিংশ শতাব্দীতে দিপাক্ষিক-বহুপাক্ষিক সম্পর্কের যুগে কতটা অচল সেটা নিয়ে কথা বলার দরকার ছিল। কিন্তু সেই আলোচনাকে দেশের ‘অভিভাবক’ প্রধানমন্ত্রী সহসাই ঘুরিয়ে দিয়েছেন হেফাজত এর সাথে তার বৈঠক আর কথাপোকথনে। অবস্য আগেই শাকিব আর অপুর সংসার নিয়ে টানাটানি এই আলোচনায় বালি ছিটিয়ে দিয়েছিল। ভারত সফরের বিষয়াদির নিবু নিবু আগুনে এক কলস পানি ঢেলে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে তার হেফাজত প্রীতি নিয়ে এবং সর্বচ্চ বিচারালয়ে গ্রিক দেবীর ভাস্কর্য অপসারনে সম্মতি দিয়েছেন যেটা নিয়েই হচ্চে আলোচনা।
গ্রিক বা রোমান সাম্রাজ্যের ন্যায় বিচারের প্রতিকী একটি চরিত্র । ২০১৬ ডিসেম্বরে সম্ভবত এটি স্থাপন করা হয়। কে বা কারা এটি স্থাপন করেছে সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। তিন চার মাসের মধ্যে এটিই এখন সবচে বড় আলোচনার বিষয়। বিচার বিভাগ দেখাশোনা করে নিশ্চই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনালয়। মন্ত্রী আনিসুল হক কিংবা প্রধান বিচারপতির সম্মতি ছাড়া এই ভাষ্কর্য স্থাপন হয়নি। এখন প্রধামন্ত্রী এমন সুরে কথা বলছেন যে অন্য কোন সরকার এটি বসিয়ে দিয়েছে। আর বলছেন যখন, এই ভাষ্কর্যটিকে প্রতিবাদের একটি নির্দিষ্ট বস্তু হিসেবে সামনে দাড় করিয়েছে ইসলামের কট্টরপন্থী গ্রুপটি। এটিকে এখন সকল সেকুলার বা উদার রাষ্ট্রনীতির পক্ষের মানুষও প্রতিকী একটি স্থাপনা বানিয়ে শক্ত অবস্থান নেবে বলেই আমি বিশ্বাস করতে চাই। কেন চাই?  কারণ, এর আগের টিও আমরা পারিনি।এবার না পারলে দুদিন পর অপারাজেয় বাংলা, রাজু ভাষ্কর্য অপসারন নিয়ে কথা উঠবে।এরি মধ্যে তো বলে ফেলেছে, সকল মুর্তির অপসারন চাই।

আগের গুলো পারিনি বলতে বুঝিয়েছি, বিমান বন্দরেরর সেই লালন বাউলের স্থাপনাকে। সেখানে রাতা রাতি ভেঙে ফেলা হয়েছিল আবহমান বাংলার প্রতিকৃতি লালন আর বাউল দলের স্থাপনাকে। তখন আইন উপদেষ্টা ছিলেন মঈনুল হক। মনে আছে এক রাতের আন্দোলনেই সরিয়ে ফেলতে বলেছিলেন সেটি। হয়েছিলও তাই। সেখানে এখন আরবিতে ঘুরিয়ে পেচিয়ে কি যেন লেখা। পড়তে চাইনি, পড়িনিও। এর আগে বেগম জিয়ার আমলে পাশ হওয়া সেই ভাষ্কর্যের বিরুদ্ধে মাঠে নেমেও খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি কট্টরপন্থীরা। তার সরকারে তখন ইসলামের নামে অন্য দল জামায়াতে ইসলামি ছিল। তারা ছিল চুপ, কিন্তু রহিম মেটাল জামে মসজিত কেন্দ্রিক খতমে নব্যুয়াত আন্দোলন (যারা একের পর এক আহমদীয়া মসজিদ ভাঙার নেশায় মত্ত হয়েছিল এক সময়)  আর এই কউমি/হেফাজতীরা মিলে একটা ঝামেলা তৈরী করতে চেয়েছিল।

সেসময়  এই একটি বিষয় ব্যাক্তিগতভাবে আমার ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল। আমি জানি আরো অনেকের-ই দিয়েছিল। আমার দেশের প্রধান প্রবেশ দ্বারে আমি আমার নিজস্ব সংষ্কৃতিকেই প্রাধান্য দেব। কিন্তু ধর্মকেই প্রাধান্য দেবার দাবীতে যারা সেই ভাষ্কর্য অপসারনে সেদিন জয়ী হয়েছিল তাদের সে জয় মানুষিক ভাবে পরাজিত করেছিল অনেককেই। যদিও তখনকার আওয়ামী লীগের তরফে সর্বভুক প্রপাগান্ডা যে ‘বিএনপি সন্ত্রাসবাদ মৌলবাদের জন্ম দিচ্চে’-এই ধারণায় বিশ্বাসী ছিলাম না। কিন্তু একটি কারণে অন্তত পরবর্তী আওয়ামীলীগ সরকারকে ভালো লেগেছে যে, মোল্লা পরিচয়ে পরিচিতদেরকে খুব বেশি বাড়তে দেয়নি শেখ হাসিনা সরকার। ব্যারাকেই রেখেছে ,ভয় ভীতি দেখিয়ে হোক আর চাপে রেখে হোক। সেই চাপের সক্ষমতা হারিয়েছে দলটি এখন? নাকি এটা স্বভাবসুলভই দলটির ভোটরাজনীতির তোষন নীতি বেরিয়ে পড়েছে? দু/তিন টা ঘটনার কথা বলি। বোঝা যাবে।

প্রথমবার যখন গনতান্ত্রিক ভাবে ক্ষমতায় আসলো বিএনপি সেই ১৯৯১ সালে। আমার রাজনীতি বোঝার একটু আধটু আগ্রহ তখন জন্ম নিচ্ছে। খালেদা জিয়ার সেই আমলে শেষের দিকে তসলিমা নাসরিনকে দেশান্তরী হতে প্রবল আন্দোলন তখন। প্রায়শই দেখতার আওয়ামী লীগ আর জামায়াতে যৌথ মিছিল। যদিও নারী নেতৃত্ব হারাম বলে সে সময় ফেনা তুলতো জামায়াত। সেই হারাম কে কিছুটা নমনীয় করতে হোক আর যে কারনেই হোন সেসময়ের আওয়ামী প্রধানের পোষাক আষাকে বেশ পরিবর্তন সাধিত হলো আস্তে আস্তে। বিপরিতে বেগম জিয়ার ‘অনৈসলামিক জীবন যাপন’ আর পোশাক আষাক নিয়ে তো গ্রামে বেশ একটা তুলনার পরিস্থিতি তৈরী হলো। ক্ষমতার পালা বদল হলো সেই সব ইসলাম পন্থী আর অনৈসলামপন্থীত্ব সম্পর্কিত আলোচনায়। যদিও এটাই মূল কারণ ছিল না।

২০০৭ সালের আগে আওয়ামী লিগ যখন সে সময় তত্ববধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে বিচারপতি কে এম হাসানের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে ক্লান্ত, সেসময় প্রফেসর ইয়াজউদ্দীনের নেতৃত্বে তত্ববধায়ক মেনে নেয়া ছাড়া আর উপায় ছিল না। সেসময় তারা যেই নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়েছিল সেই নির্বাচনে আল্লামা শাইখুল হাদিসের সাথে আব্দুল জলিল দল বল বেধে রাতে একটি চুক্তি করেছিলেন।ক্ষমতায় গেলে ফতোয়া জায়েজ করা সহ যেন কি কি ছিল সেমময়। পরে নির্বাচন বর্জন করলে চুক্তিটিও বর্জিত হয়।

এই তো সেদিন, শাহবাগ আন্দোলনের সুত্রপাত যে কারনে। জামায়াতে ইসলামের তান্ডবে কিছুটা দিশেহারা আওয়ামী লিগ যুদ্ধাপরাধের বিচার ব্যবস্থায় কট্টর অবস্থানে না থেকে কিছুটা আপসের স্থানে চলে এসেছে মনে হয়। কাদের মোল্লার ফাসি না হওয়াতে সেরকমই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন কিছু বিশ্লেষক। সেই অবস্থানকে মেনে নেননি কতিপয় তারুন্য। নিজ থেকে মাঠে দাড়িয়ে গিয়েছিলেন।সেটিকে সরকার বিরোধী প্লাটফর্ম হিসেবে দাড়িয়ে যাওয়ার শঙ্কায় কৌশলে সেখানে নিজেদের মানুষ ঢুকিয়ে বেশ ভালোভাবেই সেটার ফলাফল নিয়েছে বর্তমান সরকার। আমার বিশ্বাস, সেই তারুন্যেই সেদিন শেখ হাসিনাকে ‘নাস্তিক’ রাজীবের জানাজায় নিয়েছিল।সেই তারুন্যই তাকে কাদের মোল্লাদের ফাসির দিকে ধাবিত করেছে।সেই তারুন্যেই তাকে জোর করে সেকুলার হতে আরেক বার ঠেলে দিয়েছিল। কিন্তু, তার মনে থেকে এই কট্টরপন্থীদের ভোট বাসনা কখনই দুর হয়নি।

শেষ করবো। তবে তার আগে বলি, আমরা অন্তত এই ৯০ থেকে এই ২৭ বছরে বেগম জিয়া বা বিএনপিকে  এই ভোল পাল্টানোর রাজনীতিতে দেখিনি। বেগম জিয়া তখনকার মত এখনও মাথার কাপড় আগের জায়গাতেই রাখেন, ভ্রু প্লাক করা ছাড়া মাঠে বের হননি। জামায়াতের সাথে তার সক্ষতা নিয়ে সারা দেশ যখন তাকে মুখের থুথু ছিটিয়েছে ,তখনও তিনি লোক দেখানো ছেড়ে যাননি। নির্বাচন বয়কট করেছেন, কিন্তু তার আদর্শ বা রাজনীতির ধরন বয়কট করেন নি। এখনও তিনি ভারত বিরোধিতাই করেন, যেমন বলছেন দেশ বিক্রি হয়ে গেছে। এখনও তিনি মনে করেন, জামায়াত আওয়ামী বন্ধুত্ব ভিতরে ভিতরে আগের মতই আছে, যখন বিএনপিকে শায়েস্তা করার সময় আসবে, তখন সেটি আবারো প্রয়োগ করবেন তারা। আমি যদিও তার সব কথাকে বেদ বাক্য মনে করি না। তবে এই জায়গায় আমার সাথে তার ভাবনার মিল আছে। সে কারণেই শিরোনাম দিতে চেয়েছিলাম, যে ‘অন্তত খালেদা জিয়া ভোল পাল্টিয়ে চলেন না’
যাক গে, শেষ করবো। প্রধানমন্ত্রীর তরফে এই মূর্তি (আসলে পড়তে হবে ভাষ্কর্য) সরিয়ে নেয়ার পর তার অনেক কট্টর সমালোচক এখন শিবের গীত গাইছেন মনে মনে।তাদের সামনে আবারো সেই পর্দানশীন  ৯৬ এর প্রধানমন্ত্রী ভক্তি উকি দিচ্ছে। মাথায় হিজাব, হাতে তজবিহ, জায়নামাজে বসে দু হাত তুলে ক্রন্দনরত /প্রার্থনারত এক নারীর ছবি। সে সময় ইনকিলাব একটি শিরোনাম করেছিল, এত ধার্মিক দেশপ্রধান এর আগে আর দেখেনি বাংলাদেশ। এখন আবারো নানা কর্মকান্ডে সম্ভবত সেই হেফাজতী/জামায়াতিরা  অতিতের বেশি বেশি আওয়ামী সমালোচনা পরিহার করে চলছেন। নিসংন্দেহে খুশি হয়েছেন তারা। বিএনপি বা খালেদা জিয়ার আশে পাশের মানুষ একটু অখুশি হয়েছেন হেফাজতে হাসিনা সংশ্লিষ্টতা দেখে। এতগুলো লাশের উপর পা মাড়িয়ে কেন আপোষ করলো সরকারের সাথে এই ভাবনায়। আমি এই দুই ভাবনার বাইরে শ্রদ্ধেয় অজয় রায় স্যারের মত করেই ভাবতে চাই।আর বলতে চাই। এই ভাষ্কর্য ,সেটি যতই খারাপ হোক। এটা সরানোর সব রকম প্রচেষ্টা রুখে দেবার পক্ষে। সেখানেই আমাদের শক্তি বিবেচিত হবে। এটা ধর্মীয় বিদ্বেষ নয়, কিংবা ইসলামের অবমাননা নয়। এটা হলো কট্টরপন্থার সাথে আমার উদার পন্থার লড়াই এ টিকে থাকার প্রতিকি পদক্ষেপ।এখানে আমি শেখ হাসিনা প্রেম বা খালেদা প্রেম দেখানোর পক্ষে নই।দু:খিত!

Leave a Reply

%d bloggers like this: