ধনীর ধর্ষন, গরীবের দর্শন

এই লেখা যখন লিখছি তখন, সাফাত আর নাইম জেলে, সাফাতের বাবা আপন জুয়েলার্স এর ৫০ অধিক মন সোনা জব্দ, জুয়েলার্স সমিতি ধর্মঘটে, রেইনট্রির মালিক ঝুকিতে, এর বাইরে নাঈমের সাথে সেলফি আছে কার কার, সেটা নিয়ে ব্যাপক সরগরম আমাদের সামাজিক মাধ্যম, স্বভাবতই গরম গণমাধ্যম অর্থাৎ পত্র পত্রিকা, টিভি চ্যানেলগুলো। আর গরম আমাদের সুপারহিরো আইনশৃংঙ্খলা বাহিনী, যে এতদিন পর এমন একটা ধর্ষন মামলা পাওয়া গেল যেটার অপেক্ষায় ছিলেন হয়তো তারা এতদিনি। কেউ কেউ নিশ্চই বুঝতে পারছেন গরুর রচনা নদীতে গিয়ে পৌছেছে। বিষয়টি অনেক স্পর্শকাতর এবং সামাজিক ভুল বোঝাবুঝির অবকাশ সৃষ্টি করতে পারে, তাই শুরুতেই বনানীতে ঘটে যাওয়া ধর্ষন এবং এর প্রেক্ষিতে যে সামাজিক আন্দোলন হয়েছে সেটা উজ্জল দিক গুলো বলে নিতে চাই।

এই ঘটনার দুটি দিক আছে। একটি সাফাত-নাঈম-আর ধর্ষন সংক্রান্ত আলোচনা অন্যটি আপন জুয়েলার্স, সোনা মজুদ, অবৈধ ব্যবসা, বনানী আবাসিক হোটেল সংস্কৃতি এবং পুলিশ-শুল্ক বিভাগের খোসস ছেড়ে বেরিয়ে আসা। সাফাত-নাঈম-ধর্ষন আলোচনায় আমাদের সামাজিক আড়ষ্টতা অনেক খানি ভেঙে গেছে বলেই বিশ্বাস করছি আমি। এটা বিশাল অর্জন একটি রক্ষনশীল সমাজের জন্য। আলোচনার সীমা রেখা ভেঙে দিয়েছে খোদ ধর্ষনের শিকার সাহসী মেয়েটিই। সে নাচতে নেমে ঘোমটা টেনে দেয়নি, একবার যখন পুলিশের কাছে অভিযোগ দায়ের করেছে তখন খুলেই বলেছে, নিজে চলে এসেছে একেবারে প্রদীপের আলোর মুখে। কি সাহসী এই নারী রে বাবা ! এর আগে এমনটি কি দেখেছে বাংলাদেশ? আমি মনে করতে পারছি না, বরং মনে করতে পারছি অজস্র ধর্ষিত নারীর মরদেহ’র ছবি।আমি মনে করতে পারছি তনুর ছবি। আমি মনে করতে পারছি সাম্প্রতিক ধর্ষনের বিচার না পেয়ে বাবা-কন্যার আত্বহত্যার ছবি। সেই ছবির বিপরিতে কি চমৎকার এক ফিরে আসার ছবিই না হাজির হয়েছে বনানী-সাফাত-নাঈমের আলোচনায়।

আবারো বলছি, কেউ কেউ এই অসস্তির আলোচনায় নতুন প্রসঙ্গ সামনে নিয়ে আসতে চাইছেন। যে, মেয়ে ২টি কেন গেছে সেখানে? কেন বিবাহিত কিংবা ডিভোর্সধারী ছেলের সাথে বন্ধুত্ব করতে গেছে এসব নানা বিষয়। আবার কেউ কেউ বলতে চেয়েছেন, এক হাতে তালি বাজে না, নিশ্চই মেয়েদোর কোন দোষ ছিল, তাদের বেপরোয়া জীবনযাপন ইত্যাদি নিয়ে নানা রশের আলোচনা। কিন্তু মেয়ে দুটির বক্তব্য কে আমলে নিলেই আরো একটু অন্ধকার ধারনা আমাদের পরিষ্কার হতে বাধ্য। ‘একটা মেয়ের তরফে জোরপূর্বক শারিরীক সম্পর্ককে বাধা দিয়ে ‘না’ বলার অর্থ যে, ‘না’ সেটা বুঝতে হবে এই সমাজ কে। এটাই আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসা উচিৎ। নিশ্চই মেয়ে দুটির চরিত্র হানি করার নানান চেষ্টা অব্যহত থাকবে ভবিষ্যতে এখনও যেটা আছে। তবে আমাদের আরো গরম আলোচনা হওয়া উচিৎ. কোন মেয়েকে বন্ধুত্বসুলভ সর্ম্পকের ফাদে ফেলে তাকে উপভোগ করার প্রচেষ্টায় একটা নারী যখন না বলে, সেটা না-ই হয়, সেটা বোঝাপোড়ার ভিত্তিতে দৈহিক সম্পর্ক হয় না।

বলে রাখি, এটি অবস্যই অসস্তির আলোচনা। এখনও ৮০ ভাগ মানুষ ভাবেন বিবাহপূর্ন শারিরীক সম্পর্ক বেআইনী।তারা বিশ্বাস করতে চান, যে বিবাহপূর্ব দৈহিক সম্পর্ক খারাপ এবং তাদের নিকট কোন ছেলে মেয়ে, বা স্বজন এটাতে জড়িত নন। অসম্ভব ভুল ধারণায় আমাদের সমাজ। আজ কালকার ছেলে মেয়েদের অর্ধেকের বেশি কোন না কোন ভাবে দৈহিক সম্পর্কে আবদ্ধ হন, সামাজিক ভীতি, ধর্মীয় ভীতিকে উপেক্ষা করেই। এটা প্রাকৃতিক এবং আবহ মান কাল থেকেই প্রচলিত। যদি কোন পুরুষ আর নারী এই সত্য অস্বীকার করেন প্রকাশ্যে, তাহলে তার উচিৎ হবে শুভ্র,সাদা কাপড় পড়ে মানুষকে তাবিজ বিলানো। কেননা, তিনি সত্য সর্গের ভিন্ন বাসিন্দা এই সময়ে।
সাফাত নাঈম আর বনানী রেইনট্রি সংক্রান্ত আলোচনায় আমাদের তুলনামূলক সচেতন এবং সামাজিক মাধ্যমে অভ্যস্ত পুরুষকুল যেমন ধাক্কা খেয়েছে এবং নিজেদের অতীত কর্মকান্ড পর্যালোচনার সুযোগ পেয়েছে, তাতে নিশ্চই ভবিষ্যতে তারা মেয়েদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ন সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে শারিরিক সম্পর্ক স্থাপনে আরো বেশি সতর্ক হবেন।যেটা সুস্থ সমাজের জন্য জরুরী। অন্যদিকে, মেয়েদের মধ্যে যারা এমন ঘটনার স্বীকার তারা একটু সাহস পাবেন যেন, ভবিষ্যতে এমন অনাকাঙ্খিত ঘটনা চেপে রেখে . দুমড়ে মুষড়ে না মরে প্রতিবাদ করার ক্ষেত্র পাবেন। তবে সে আলোচনায় যাচ্ছি না, বলছি, এই লেখার শিরোনাম নিয়ে।

মাসে এমন কতজন নারী ধর্ষন বা শারিরীক লান্চনার শিকার হন বাংলাদেশে? সঠিক পরিসংখ্যান কি আছে? আইন ও সালিস কেন্দ্রের পরিসংখ্যানের বাইরে ব্রাকের তথ্য বলছে বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে ২ জন শিশু ধর্ষিত হন। ২০১৬ সালে এক বছরে এক হাজারের বেশি ধর্ষনের তথ্য আছে বাংলাদেশ প্রতিদিনের ৮ জানুয়ারীর এক প্রতিবেদনে।  জার্মান ভিত্তিক বাংলা সংবাদ মাধ্যম দয়েতসে ভেলে (ডি ডব্লিউ)  জুলাই এর ২৭ তারিখ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলছে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) সারা দেশ থেকে গড়ে প্রতিদিনই গড়ে চার-পাঁচজন নারী ধর্ষণের শিকার হয়ে চিকিত্‍সা নিতে আসছেন৷ আর প্রতিমাসে দেড় থেকে দুই শতাধিক ধর্ষিতাকে চিকিত্‍সা দিচ্ছেন তারা৷ এই হিসাব হচ্ছে যারা ওসিসিতে চিকিত্‍সা নিতে আসেন তাদের৷ এছাড়া দেশের অন্যান্য হাসপাতাল এবং চিকিত্‍সা কেন্দ্রে যারা চিকিত্‍সা নেন তাদের হিসাব নেই ওসিসি’র কাছে৷ চিকিত্‍সার বাইরে যারা থাকেন, ‘সামাজিক লজ্জায়’ যারা ঘটনা প্রকাশ করেন না তাদের হিসাব পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই৷ ওসিসি’র মতে সাধারণত এর শিকার ১৮-১৯ বছর বয়সি মেয়েরা৷ আর খোদ রাজধানী ঢাকার চিত্রটি কিছুটা হলেও পাওয়া যায় পুলিশের হিসাব থেকে৷ ঢাকা মহানগর পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত নারী-শিশু নির্যাতনের ঘটনায় রাজধানীর বিভিন্ন থানায় ৫৫৪টি মামলা হয়েছে৷ এর মধ্যে রাস্তা থেকে অপহরণ করে গাড়ির মধ্যে নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের মামলা রয়েছে অন্তত ৫০ ভাগ৷ ‘

থাক আর বাড়ালাম না পরিসংখ্যানের খাতা। এই শাফাত-নাঈম কর্মকান্ডের সপ্তাহখানেক আগে গাজীপুরে এক কিশোরী কন্যার ধর্ষনের বিচার না পেয়ে আল্লার কাছে বিচার দিতে এই ধর্ষনের অবাধ ভুমি থেকে চিরবিদায় নিয়েছেন বাবা আর কন্য আত্বহত্যা করে। একজন বাবার কাছে তার সন্তান যখন ধর্ষনের  বর্ননা করেন, আর সেই বাবা যখন তার বিচার চেয়ে না পান, তখন তার বেচে থাকাটাই মরার মত বেচে থাকাতে পরিনত হয়। গাজীপুরের সেই বাবার প্রতি শ্রদ্ধা যিনি জীবন্ত মৃত না থেকে আত্বহননকেই সেরা পথ মনে করেছেন। এই সমাজের চোখে খুটি পুতে দিয়ে গেছেন। সে কারনেই হয়তো পরের সপ্তাহে সাফাত নাঈম আর বনানী হোটেল এত আলোচনায়। দীর্ষ ২ সপ্তাহ ধরে গরম আলোচনা প্রতিবাদ আর নানান খোলা কথায় সমাজের উচু নিচু বিষয়গুলি একটু পারিবারিক ভাবে ‘ডিফ্রাগমেন্ট’ করা গেছে। সেজন্য সংশ্লিষ্ট ধন্যবাদ।

তবে এই আলোচনায় গল্পের গরু গাছে উঠেছে সেটা ভীতিকর। অনেক ভীতিকর এই কারনে যে, যেই সমাজে সন্তানের অপরাধে বাবার বিচার হয়, ব্যবসা প্রতিষ্টানের ভবিষ্যত অন্ধকার হয়, শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগ আর পুলিশ ধর্ষনের বিচারের চাইতে ব্যবসা প্রতিষ্টান সিলগালা করার দিকে নজর দেন ,সেটা একটা দীর্ঘ মেয়াদী ভয় ঢুকিয়ে দেয়ার নামান্তর। সন্তানের অপরাধে বাবার বা পরিবারের ক্ষতি হতে দেয়াটা  একটা অসভ্য সমাজের প্রতিচ্ছবির কথাই বলে। বাবার যদি অবৈধ ব্যবসা থেকে থাকে সেটা ভিন্ন তদন্তের বিষয়। রাষ্ট্রের নিয়মিত আইন বিভাগ সেটা তদারকি করাই ভালো।সেটা না হয়ে এখানে এক সন্তানের অপরাধে তার এত দিনের ব্যাবসায়িক উদ্যোগকে মাটিতে মিশিয়ে দেয়ার কাজে হাত দিয়েছে রাষ্ট্র।

কেননা, এখানে আভিজাত্য আছে। এখানে টাকার লেনদেন এর গল্প আছে। এখানে বনানী হোটেল আছে। এখানে রেইনট্রি হোটেলের মত আরো শ খানেক হোটেল কে শায়েস্তা করার উপকরণ আছে। এখানে আপন জুয়েলার্স এর স্বর্নের মত আরো বস্তা বস্তা স্বর্ণের হাতছানি আছে। এখানে নারীকে নিয়ে গল্পের ফাদ পাতার রশদ আছে। এই সবই ধনাট্য সমাজের উপকরন। সেখানে একজন নারীর ধর্ষনকে নানা উপকরনে ধর্ষন হিসেবে বিবেচানা করতে কেউ-ই সময় নেননি। কিন্তু এই রাষ্ট্রের, এই সমাজের, এই সামাজিক মাধ্যম, এই গণমাধ্যমের, এই পুলিশ বাহিনীর, এই শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগের কোন দায় নেই, প্রতিদিন যে ২ জন শিশু ধর্ষিত হয় তার জন্য। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) সারা দেশ থেকে গড়ে প্রতিদিনই গড়ে চার-পাঁচজন নারী ধর্ষণের শিকার হয়ে চিকিত্‍সা নিতে আসছেন-তাদের জন্যেও কোন দায় নেই। দায় নেই, গাজীপুরেই ঐ গরীব পিতার জন্য, বা  তার মত হাজারো গরীব পিতা-মাতার জন্যে। ওগুলো শুধুই ‘দর্শন’ চেয়ে চেয়ে দেখে যাওয়ার বিষয়। ধনীর ধর্ষন, গরিরের ক্ষেত্রেও ধর্ষন বিবেচিত হতে আর কত দেরী? এই রাষ্ট্র কি তনুর ধর্ষন পরবর্তী হত্যার বিচার করেছে?

নিউইয়র্ক, ১৯ মে ২০১৭

Leave a Reply

%d bloggers like this: