প্রধানমন্ত্রী কি আমৃত্যু ক্ষমতার কথাই বলছেন?

মাঝে মাঝেই বেশ ইঙ্গিতপূর্ন কথা বার্তা বলেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। লক্ষীপুরের জনসভায় তিনি এক দিকে নৌকার পক্ষে ভোট চেয়েছেন। বর্তমান প্রেক্ষিতে তার নিজের আসনে তার নিজেকেই ভোট দেয়ার সুযোগ পাননি প্রধানমন্ত্রী ২০১৪ সালে। এমনি ভাবে তার ৩০০ সংসদ সদস্যের কেউই নিজেকে নির্বাচিত করার জন্য ভোট দেয়ার সুযোগ পাননি।বাকীদের ভোট হয়েছে নিজেরা নিজেদের মাধ্যমে। ভাগ যোগের ভোটের মাধ্যমে যেই সরকারের অস্থিত্ব নিয়ে সে সময় ধারণা ছিল যে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য এই নির্বাচনের মেয়াদ হবে সামান্য দিন, এবং সবাইকে নিয়ে আরেকটি জাতীয় নির্বাচন হয়তো সময়ের ব্যাপার। সেই নির্বাচনে টিকে যাওয়ার পরিক্ষায় বেশ সাফল্যের সাথে টিকেছেন তো বটেই, এমনি আগামীতে ২০১৯ সালে আরো ভালো ভাবে ক্ষমতায় টিকে থাকতে সব পথ তৈরী করেছেন তিনি। তাতেই তার নির্বাচন নির্বাচন খেলায় ভোট চাওয়ার বিষয়টি অনেকের কাছে বেশ কৌতুকপ্রদ এবং পরিহাসমূলক।কিন্তু তিনি সেই পরিহাসমূলক অবস্থাতেও একটি কথা বলেছেন, যে প্রয়োজনে বাবার মত জীবন দিয়ে হলেও দেশের জন্য উন্নয়ন করবেন।

প্রধানমন্ত্রীর এই কথায় যারা জীবনের বিনিময়ে রাজনীতি আর উন্নয়নের প্রতিশ্রুতির কথা জানেন, তারা হয়তো কিছুটা শঙ্কায় মুড়ে গিয়ে বলতে চাইছেন, না প্রধানমন্ত্রী আপনার জীবনের বিনিময়ে উন্নয়ন চাই না। আবার যারা ভিতরের রাজনীতির এই বদ উদ্দেশ্য সর্ম্পকে জানেন তারা ভাবছেন, তিনি কি জেনে বুঝে তার মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার ইঙ্গিত দিয়েছেন? সেরকম কিছু হলে নিশ্চই এই উন্নয়েনর ধারনা সংক্রান্ত কুইনাইন খেয়ে হজম করা ছাড়া আর কোন গতান্তর দেখছেন না। উন্নয়ন এর পরিবর্তে উন্নয়নের ধারনা শব্দটি কেন ব্যবহার করছি সেই ব্যাখ্যায় যাওয়ার আগে, একটু ধারনা দেয়ার দরকার, যে আমাদের দেশে জীবনের বিনিময়ে উন্নয়ের খেশারত গুলি বড়ই যে পথ হারানো মূলক একেকটি বাক ছিল, সেটা বোধ হয় প্রধানমন্ত্রী নিজেও মানবেন।

প্রথমত আপনার বাবার কথাই বলি। বাংলাদেশের স্থপতি বা তিনিই স্বাধীন বাংলাদেশের রুপকার, জন্মদাতা বা সহজ হিসেবে বঙ্গবন্ধুই বাংলাদেশ সৃষ্টির অগ্রনায়ক।একজন পিতা যখন সংসার থেকে মারা যান, নিশ্চই সেই সংসার বেহাল পথেই চলে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সেটাই হয়েছিল। বাংলাদেশ সৃষ্টির পর সেই দেশের রুপকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান আরো স্বাধীন ভাবে দেশকে কয়েকবছর নেতৃত্ব দিতে পারলে অন্যরকম হতে পারতো বাংলাদেশের চেহারা। তিনি, নিজের জীবনের বিনিময়ে বাংলাদেশের উন্নয়ন করতে চেয়েছিলেন। তাইতো বেশ কিছু হটকারী সিদ্ধান্ত তিনি নিয়েছিলেন তার রাজনৈতিক জীবনে। স্বৈরশাসনের প্রতি ঘৃনা থেকে মুক্তির যে লড়াইয়ে তিনি লক্ষ লক্ষ মুক্তিকামী জনতা তৈরী করলেন, স্বাধীনতার পর সেই লক্ষ লক্ষ কোটি মুক্তিকামী জনতাকে আবদ্ধ করে ফেলতে চাইলেন একদলীয় শাসনের জালে।সেটা তিনি করলেনও কিছু দিনের জন্য। মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে খর্ব করে ফেলেছিলেন, নিজের বুদ্ধিতে হোক আর সময়ের বাস্তবতায়। সেটির ফল ভালো হয়নি।

নিজের জীবনকে তিনি শত্রুদের কাছে একমাত্র প্রতিশোধের লক্ষ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন জানা, কিংবা অজানায়। আমি যেটা বলতে চাইছি, যে তার মৃত্যু বাংলাদেশর সঠিক পথ বাতলে দেয়নি, দিয়েছে একটি বিক্ষুব্ধ এবং ঝড়ঝান্জা পূর্ন একটি চলার রাস্কা। পারিবারিক ভাবি আপনি যেমন পিতৃহারা হয়েছিলেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী , দেশটাও তেমন পিতৃহারা হয়েছিল। ফল নিশ্চই ভালো হয়নি। ২১টি বছর ক্ষমতার বাইরে ছিলেন আপনারা। সেটার শোধ নেয়ার বাসনা আপনার মনে নিশ্চই অনেক দিনের। সেই হিসেবে ২০০৮ থেকে হিসেব করলে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ১০ বছরের বেশি ত হবেই। তাহলে কি আরো ১/২ টি নির্বাচনে আমাদের এই নির্বাচন নির্বাচন খেলা মেনে নিতে হবে?

মাঝে জীবনের বিনিময়ে উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি পালন করতে গিয়ে মারা গেছেন আরেক রাষ্ট্রনায়ক মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান। বিএনপির প্রতিষ্টাতা , স্বাধীনতার ঘোষনা পাঠকারী চৌকষ এই সেনা নায়ক মনে মনেই রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য বাসনা জাগ্রত রেখেছিলেন অনেক দিন। আপনার বাবার মৃত্যুর গুন্জন যখন চারিদিকে, তখন একজন বন্চিত সেনা অফিসার হিসেবে স্বাধীন বাংলাদেশের রুপাকারকে বাচাতে পদক্ষেপ নেননি, বরং তার সহকর্মীদের হাতে আপনার বাবার মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর স্বাধীন বাংলাদেশের সৌভাগ্যের বরপু্ত্র হিসেবে তিনিই চলে আসেন আলোর সামনে। তিনিও নিজে ব্যাক্তি জীবনে সততা আর রাষ্ট্র পরিচালনায় নিজের জীবন উৎসর্ব করতে চাইলেন। কিন্তু সেই কাজ করেতে গিয়ে বেশ কিছু অকাজ হলো তার হাত দিয়ে।

আপনার বাবার হাতে মৃত্যু হওয়া গনতন্ত্রকে পূনরুজ্জীবিত করতে গিয়ে তিনি রাজনীতিতে পূনর্বাসন করলেন দেশের স্বাধীনতা বিরোধীদের বেশ কয়েকজন কে। উন্নয়নের চাকা তিনি ঠিকই ঘুরিয়েছিলেন, কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশকে দীর্ঘ মেয়াদা ভোগাতে তিনি কিছু বিষগাছ রোপন করেছিলেন, যার ফল এখনো বেশ তিক্ত এবং ঐতিহাসিক ভাবে বেশ অরুচিকর। তার রাষ্ট্রপরিচালানার হটকারী সিদ্ধান্ত, নিজের ক্ষমতার পথকে পাকা করতে যাদেরকে সামনে প্রতিবন্ধকতা হিসেবে পেয়েছেন, তাদেরকেই তিনি শুলে চড়িয়েছিলেন। জীবনের বিনিময়ে উন্নয়নের ধারণায় তার জীবন দিতে হয়েছিল।

বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর জিয়াউর রহমানের মৃত্যু দেশের জন্য ছিল আরেকটি ক্ষতি। দেশকে পূর্নগঠন পথে অনেক দুর আগিয়েছিলেন তিনি। গ্রামীন অর্থনীতি পূর্নগঠনে তার স্বপ্ন ছিল বেশ বাস্তবতামুখি। তিনি আর্ন্তজাতিক অঙ্গনে দেশকে একটি মর্যাদাপূর্ন অবস্থানে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিলেন। তার মৃত্যুর আগে আগে তার মতই আরেক জীবনের বিনিময়ে উন্নয়ের স্বপ্নদ্রষ্টা সেনানায়ক এরশাদ প্রস্তুত হচ্ছিলেন। পরে জিয়ার মৃত্যুর ব্যবস্থা পাকা পোক্ত করে, তার হত্যাকারীকে হত্যা করার পর ক্ষমতার মসনদে তিনিই বসে যান।

অবস্য ৯ বছর উন্নয়ন করার পর ক্লান্ত হয়ে পড়া এরশাদ এখণ আর নিজের জীবনের বিনিময়ে উন্নয়নের তত্ব ঘাটেন না, বরং জীবনের জন্য পশ্চাদলেহন নীতির পূজারী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন সফলভাবেই। তার মতই আসলে বাংলাদেশের জনগন উন্নয়ন বাটিকায় ক্লান্ত। উন্নয়ন চান, কিন্তু কোনটা উন্নয়ন আর কোনটা অবনয়ন সেটা কাউকে ঘাড় ধরিয়ে বুঝিয়ে দেবার শক্তি নেই বাংলাদেশের মানুষের। তাই যেটা উন্নয়ন বলা হয় সেটার  প্রতি এক ধরনের বিতৃষ্ণা নিয়েই চোখে চোখে রাখে সেই সব রাজনীতিবিদদের যারা উন্নয়নের কুইনাইন খাওয়াতে চায় দেশকে, যদিও দেশের মানুষ তাদের সংঙ্গায় উন্নয়ন চায়, রাজনীতিবিদরা নিজেরে মিলেমিশে থেকে একটু বিরতি দিয়ে তাদের শাসন করবে সেটাই চায়।

একারণেই, আপনার কথা নিয়ে যথেষ্ট চিন্ত্রার উদ্রেক হয়েছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। উন্নয়নের সংঙ্গা বলতে আপনি যেটা মানেন আর বোঝেন সেটাই যে একমাত্র উন্নয়নের পথ নয় সেটা বোঝার সক্ষমতা তৈরী হওয়াটাই একটা উন্নয়ন। মানুষের স্বাধীন মত প্রকাশের সুযোগ থাকাটা একটা উন্নয়ন। মানুষ তার পছন্দমত শাষিত হওয়ার নেতৃত্ব নির্বাচন করবে, সেটাই বড় উন্নয়ন। মনে আছে নিশ্চই যে ইয়াহিয়া আর আইয়ুব খানেরা দেশকে উন্নয়নে ভরিয়ে ফেলছিলেন একসময়। বড় বড় বিল্ডিং, রাস্তা ঘাট আর স্থাপনায়। কিন্তু এ দেশের মানুষের নিজের পছন্দের নেতা শেখ মুজিবের দ্বারা শাষিত হওয়ার আকাঙ্কা পোষন করেছিলেন ১৯৭০ এর নির্বাচনে। যেটাকে উন্নয়নের প্রতিবন্ধকতা মনে করেছিলেন ইয়াহিত আর আ্‌ইয়ুব গং।  ফলাফল মুক্তি সংগ্রাম। একই পথে হাটলেন মুক্তি সংগ্রামেন নায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবার রহমান। এভাবে ইতিহাসের পালা বদল হয় কিন্ত শিক্ষা হয় না রাজনীতিবিদদের। মানুষ হারায় তার পছন্দের নেতাকে, দেশ হারায় গুনি রাজনীতিবিদদের। আমরা আপনার রাজৈনতিক বিচক্ষনতাকে দেশের জন্য সম্পদ মনে করি। দেশের এগিয়ে যাওয়ার পথে ভুল ভ্রান্তি হবে, অন্যরা স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় রাজনীতি করবে, স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় আপনাকে নির্বাচিত করার জন্য তুমুল প্রতিদ্বন্দীতাপূর্ন নির্বাচনী পরিবেশ চায় জনগন। আমার ভোট আমি  দেব, আপনার ভোটও আমি দেব’- এই নীতির নির্বাচন চায়না জনগন। দয়া করে এটা বুঝে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় রাজনীতি করেন, এটাই কামনা। এমন কোন কিছুই করা উচিৎ হবে না অথবা করার পথে ধাবিত হওয়া উচিৎ হবে না যেখানে আ্পনার সমর্থকরা ভাবতে থাকবেন, যে আপনার জীবন সংকটাপন্ন। আপনার জীবনের বিনিময়ে উন্নয়ন চাইনা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। আপনার স্বাভাবিক রাজনৈতিক নেতৃত্ব আর বিচক্ষনতা আগামী দিনের রাজনীতির জন্য উন্মুক্ত রাখুন। নির্বাচনকে অর্থবহ করতে ভুমিকা নিন। প্রয়োজেন হেরে যাওয়া আর কিছুদিনের জন্য ক্ষমতা থেকে দুরে থাকার মানষিকতা তৈরী করেন। কারন, ক্ষমতা যে চিরস্থায়ী নয়, সেটা বোঝার জন্যে হলেও ক্ষমতা থেকে দুরে থাকার মানুষিকতা তৈরী হওয়াটা প্রয়োজন। আপনার দীর্ঘায়ু কামনা করি।

নিউইয়র্ক, ১৫ মার্চ

One thought on “প্রধানমন্ত্রী কি আমৃত্যু ক্ষমতার কথাই বলছেন?

Leave a Reply

%d bloggers like this: