বিএনপি-জামায়াত, আওয়ামী-হেফাজত?

ক্ষমতায় অনেক দিন থাকলে নীতির বদল হয়, অবস্থানের বদল হয়, কৌশলের পরিবর্তন হয়, যখন যেই বাটিকা প্রয়োজন সেই বাটিকায় ফিরে যাওয়া যায়, অনেক ভাবে টিকে থাকার পন্থা জানা যায়।২০০৮ সাল থেকে সাড়ে ৮ বছর ক্ষমতায় থেকে প্রধানমন্ত্রীর ভাবনায় বেশ খানিকটা পরিবর্তন সাধিত হয়েছে বলে আপাতত আমি নিশ্চিত।তবে সেটি মানষিক পরিবর্তন নাকি ঝড়ের পূর্বাভাস এ কৌশল পরিবর্তন সেটা নিয়ে এখনো অনেক মানুষ সন্দিহান।অবস্য সর্বশেষ প্রধানমন্ত্রীর কথার প্রকাশে তিনি বিষয়টিকে অন্তর দিয়েই ভাবছেন বলে মনে হয়েছে। এই সুবাদে এতদিন যারা ইসলাম বিরোধী ইসলাম বিরোধী, নাস্তিকের দল বলে গালি দিয়েছেন আওয়ামী লীগকে তারা এখন বিপাকে পড়েছেন। ফরহাদ মজহার কিংবা মাহমুদুর রহমান গং যারা এতদিন বলে আসছেন, হুজুরদের কে মুল ধারায় নিতে হবে, তাদেরকে এখন যদি প্রধানমন্ত্রী উপদেষ্টা বানিয়ে ফেলেন, তাতে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। তবে সলিমুল্লাহরা কষ্ট পাবেন এবং পাচ্ছেন নিশ্চই। কেননা, তারা এখন গাইছেন, চেয়ে চেয়ে দেখলাম তুমি চলে গেলে’…..

সোমবার আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী কওমী মাদ্রসার স্বীকৃতি প্রদানে তার সরকারের উদার অবস্থানের প্রেক্ষিত ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বেশ কিছু কথা বলেছেন। একটি তো অবস্যই সুপ্রীম কোর্টের সামনের গ্রিকদেবীর ভার্ষ্কর্য অপসারনে তিনি আবারো কঠোর অবস্থান ঘোষনা করে বলেছেন, এটা নিয়ে প্রধান বিচারপতিকে পর্যন্ত তার অসন্তোষের কথা জানিয়েছেন।এর কয়দিন আগে তিনি প্রধান বিচারপতির উপস্থিতিতে একটি শক্ত কথা জানিয়েছিলেন :ক্ষমতা কারও কিন্ত কম নয়’। এসব কথা নিয়ে আলাদা আলাদা বিশ্লেষন হওয়া দরকার ছিল। হয়েছে নিশ্চই, দুরে থাকার কারণে হয়তো খেয়াল করতে পারিনি। তবে আওয়ামী শীর্ষ নেতাদের সামনে বেশ শক্ত করে প্রধানমন্ত্রী একটি কথা বলেছেন যে হেফাজতের সাথে তার দলের কোন চুক্তি হয়নি। আর কওমী মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদেরকে মূল ধারায় ফিরিয়ে নেয়ার উদ্যোগের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেছেন, ‘এই বিশাল জন গোষ্টী কি দেশের নাগরিক নয়, তারা কি রাষ্ট্রের স্বীকৃতির বাইরে থাকবে, তাদের কে মূল ধারায় ফিরিয়ে না নিলে কি এগিয়ে যাওয়া যাবে?’ ইত্যাদি ইত্যাদি।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অনেক ধন্যবাদ।এই ভাবনা আমার মাথায় যারা ঢুকিয়েছে তাদেরকে ধন্যবাদ।অনেক জল ঘোলা করে, শেষ পর্যন্ত একটি সুদুর প্রসারী অর্ন্তভুক্তিকরনের চিন্তা করছেন আপনি।যেটার প্রয়োজনীয়তা বোঝাতে ব্যার্থ হয়েই ফরহাদ মজহারের মত বুদ্ধিজীবি আপনার চক্ষুশুলে পরিনত হয়েছে। জেল জরিমানা হয়েছে মাহমুদুর রহমানের। এখন নিশ্চই আপনি স্বীকার করবেন, যে ফরহাদ মজহাররা এতদিন একটা কথাই বলেছে যে, শাহবাগের তারুন্যের বাইরে যে তারুন্য আছে তাদেরকেও আপনার গননায় নিতে হবে। ৯০ ভাগ মুসলিমের দেশে আপনি গুটিকয়েক অথবা দেশের অর্ধেক তারুন্যের দাবীকেই দেশ পরিচালনার নীতি হিসেবে নিলে বিভাজন অনিবায্য। এই কথা আমি ফরহাদ মজহারের পক্ষ নিয়ে আপনাকে বলছি না, এটাই আপনার সরকার পরিচালনার সাথে ফরহাদ মজহারের চিন্তার ফারাক তৈরী করেছিল। ২০১৩ বা ১৪ সালে কোন একময় তার সাথে আমার দীর্ঘ সাক্ষাৎকার নেয়ার সুযোগ হয়েছিল, যেটি তখন নানা রাষ্ট্রীয় আর সামাজিক মাধ্যমের চাপে তা প্রকাশ করতে পারিনি। সাক্ষাৎকার নেয়ার সময়ই তিনি বলছিলেন, এটা তুমি চালাতে পারবে না, খামোখা নিচ্চ।সেটাই হয়েছিল। তিনি আমাকে স্পষ্ট বলেছিলেন মনে আছে যে, এই মাওলানা বা জামায়াতে ইসলামের রাজনীতির সমর্থক তরুন শিবির কর্মীদের আপনি দেশের তারুন্য থেকে বাদ দিলে সেটা বৃহৎ রাষ্ট্রীয় ভুল। তারা যতই সংখ্যায় নগন্য হোক না কেন।

২০১৩ সালের ২৮ মার্চ ইত্তেফাকে ফরহাদ মজহারের কলামের কিছু অংশ এখানে তুলে দিচ্ছি।

‘ ইসলাম ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের এই রাজনৈতিক বিভাজন কাটিয়ে উঠে সমাজের ক্ষত যদি নিরাময় করতে চাই তার জন্য দূরদৃষ্টি এবং রাজনৈতিক প্রজ্ঞার দরকার। আমাদের সমাজে তার অভাব আছে। ইসলামের বিরুদ্ধে ঘৃণার যে সংস্কৃতি গত ৪০ বছর চর্চা করা হয়েছে তার মূল্য দিতে হবে অনেক। আমরা এখনও কী ঘটেছে সে সম্পর্কে বেহুঁশ হয়ে আছি। দরকার সততার সঙ্গে এই ভয়ংকর সত্যের মুখোমুখি হওয়া এবং রাজনৈতিক সংকটের উত্পত্তির কারণ উপলব্ধি করা। সমাধানের সম্ভাব্য পথগুলো তখনই শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে। বাংলাদেশের ভবিষ্যতের কথা ভেবে সেই কাজগুলো করতে হবে। তবে সে কাজে আমাদের অযোগ্যতাই প্রমাণিত হয়েছে বারবার।’

পরে হেফাজতের সাথে সরকারের বৈঠক আর কওমীর স্বীকৃতি পর ফরহাদ মজহার সাহেব এর আরেকটি কলাম খুজে পেলাম দৈনিক যুগান্তরে। ২১ এপ্রিল সেটি প্রকাশিত হয়েছে যেখানে তিনি লিখেছেন;

‘ এটা পরিষ্কার যে, ঢাকা শহরকেন্দ্রিক চরম সুবিধাবাদী ও এলিট শ্রেণীর উৎকট ইসলাম বিদ্বেষের গালে হেফাজত দুর্দান্ত চপেটাঘাত করতে সক্ষম হয়েছে। …. যাদের মাত্র ২০১৩ সালে গুলি করে মেরে এই শহর থেকে তাড়িয়ে দেয়া হয়েছিল, যাদের লাশের হিসাব পর্যন্ত করা যায়নি, আজ সেই তাড়া খাওয়া এবং হত্যা, গুম ও নির্যাতনের শিকার কওমি মাদ্রাসার আলেম-ওলেমাদের স্থান হয়েছে সরকারের উচ্চ দরবারে। খোদ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে। রাষ্ট্রের ক্ষমতা ও শক্তির সর্বোচ্চ দরবারে তারা উচ্চ মর্যাদার মেহমান হয়ে হাজির হয়েছেন। আল্লাহর কুদরত দারুণ!!’

তিনি নিজে ব্যাক্তিগত ভাবে স্রষ্ঠায় বিশ্বাসী মানুষ নন,ধর্ম বিশ্বাস তো প্রশ্নেই উঠে না। তার সত্য কথন গুলি সে সময় খুব তীরের মত ব্যাথা দিয়েছিল আমাদের সেকুলার গোষ্টীকে।লুঙ্গি মজহার , লুঙ্গি মজহার বলে তাকে গালি দিতে কম করিনি আমরা। আমরা মানে বলতে চাইছি যারা সরকারের সমর্থক তারা। যারা নীপিড়নের সমর্থক তারা। যারা মনে করেন গুলি মেরেই স্তব্ধ করা যায় সবকিছু তারা। যারা মনে করেন, জামায়াত শিবির, হেফাজত, কওমী মাদ্রাসার হুজুররা দেশের শত্রু তারা। আমরা মানে যারা সেক্যুলার ভাব ধরে আসলে চরম স্বৈরতন্ত্রকে দমনের হাতয়ার মনে করি তারা। এই আমরা এখন কি আঙ্গুল চুষছি? আর ভাবছি কোথাকার জল কোথায় গেল, কোন দিক দিয়ে গড়ালো? কেন আমাদের গাইতে হচ্ছে, চেয়ে চেয়ে দেখলাম তুমি চলে গেলে…?

তুমি চলে গেলে মানে হলো,আওয়ামী লীগ চলে যাচ্চে। বিএনপি এর সাথে যদি আন্দোলন আর সরকার পরিচালনায় জোট বাধার কারনে একটা জোটবদ্ধ নাম হয় ‘বিএনপি-জামায়াত’ তাহলে এখন নতুন নামে আওয়ামী লীগকেও ডাকার প্রস্তুতি নেন সবাই। কি সেই নাম ‘আওয়ামী-হেফাজত’। আগামি দিনে আসলে এই দুই জোটের মধ্যেই আপনাকে বেছে নিতে হবে কে আসলে মন্দের ভালো? মধ্যপন্থী বিএনপি আর মধ্য ডানপন্তী ( বলছি একারনে যে জামায়াত এখনো গনতান্ত্রিক ভোটের রাজনীতিতে বিশ্বাসী) জামায়াত জোট ভালো নাকি মধ্য  বাম পন্থী আওয়ামীলীগ আর চরম ডানপন্থী, ফতোয়া আইনের পৃষ্টপোষক হেফাজত মিলে আওয়ামী-হেফাজত জোট ভালো! মঈনুদ্দীন বাদল আর ইনু মেননদের দিন শেষ। ক্ষমতার বার্গার খেতে খেতে এরা এখন মুটিয়ে গেছে। এখন তো মিউ মিউ করছে ইনু-মেনন, দুদিন পর পালাতে হবে। পালাতে যে হবে সেটা নিশ্চিত কেননা, এখন হেফাজত ভক্ত হিসেবে শামীম ওসামান রা তাদের ভক্তি শ্রদ্ধা প্রকাশ করতে শুরু করেছেন। বলছেন, নাস্তিন নিধনে তিনিই এখন নেতৃত্ব দেবেন। যাকগে, সে বিষয়ে বিস্তারিত আলাপ না করে আরেকটি ভাবনায় যাই। সেটা হলো, কেন এই আওয়ামী-হেফাজত জোটের রুপান্তর?

একটা বিষয় হতে পারে আগামিতে খেলার জন্য জুতসই কোন কার্ড নেই শেখ হাসিনার সামনে। যুদ্ধপরাধের দায়ে শীর্ষ জামায়াত নেতাদের ফাসি হয়েছে, বলার মত আর কেউ নেই দেলোয়ার হোসেন সাঈদী ছাড়া। উনাকে কুমিরের শেষ বাচ্চা হিসেবে রেখে দেয়া হয়েছে। যখন আর কোন ভাবেই কোন কিছুর মোড় ঘোরানো যাবে না তখনই হয়তো সামনে আসবে সে ইস্যু। কিন্তু এই একটা ইস্যু দিয়ে তো আর ২০১৯ সালের পুল সিরাত পার হওয়া যাবে না। এমনিতেই হেফাজতের রক্তের দাগ এখনো শুকায়নি বলেই বিশ্বাস করেন মাদ্রারা শিক্ষার্থারী। তারা সংখ্যায় যদি ৩০ লক্ষ হন, তবে বাংলাদেশের আরোর ৩ কোটি মানুষ মনে মনে তাদের প্রতি দূর্বল। এমনকি চরম আওয়ামী লীগ পন্থী মানুষটাও মনে করেন যে, তারা তো দোষ করেনি। আর বিএনপির ৯০ জনই বিশ্বাস করেন, হেফাজত গনহত্যার শিকার হয়েছিল শাপলা চত্তরে। এই হেফাজত যদি আবার মাঠে নামে তবে প্রতি ৩ জন হেফাজত কর্মীর সাথে সহমর্মীতা প্রকাশে আরো ৩০ জন মানুষ রাস্তায় নামবে শুধু ইসলাম রক্ষার কথা বলে। এই ৩০ জনের মধ্যে হয়তো ৫ জন শিবির, বাকী ২০ জন বিএনপি, আর ৫ জন ইসলামী প্রিয় আওয়ামী লীগ কর্মি বা ক্ষমতা বন্চিত কর্মী। সেই ভবিষ্যতকে দেখতে পেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আর সেই জঙ্গী আন্দোলন দমনে আবার নির্বিচারে হত্যাকে তিনি সমাধান মনে করতে পারছেন না। কেননা, তার ক্ষমতায় থাকার কোন নৈতিক ভীত নেই। যুদ্ধাপরাধের বিচার হয়ে গেছে, এখন আর দ্বিত্বীয় মেয়াদে তার চেয়ার দখলে রাখার পক্ষে অতটা উচ্চকন্ঠ নয় এলিট সেকুলার শ্রেনীও। এ সময় নতুন একটি পুবালী বাতাসে সব তছনছ হয়ে যাওয়ার আগে ঘর সামলে নিয়েছেন তিনি। হেফাজতের হাতে ইস্যু নেই। ইসলাম রক্ষার হাড্ডিটুকুতে একটু কওমী স্বীকৃতির গোসত লাগিয়ে ছেড়ে দেয়া হয়েচে। সেটাই চেটেপুটে খাবে এখন তারা। এই সময়ে আরো একটু শান্তিতে থাকার চেষ্টা আরকি।

সরকারের বিশেষ দূত এরশাদের ফমূলা এটি। সরকার পরিচালনায় ভিত্তি যতই দূর্বল হয় ততই ইসলাম রক্ষার বাটিকা সামনে আসে। সম্ভবত তার আমলেই সুপ্রীম কোটের চত্তরে প্রতিষ্টিত জাতীয় ঈদগাহের রক্ষায় এখন রেমেসিস দেবীর অপসারণ সময়ের ব্যাপার মাত্র। আমি শুধু চেয়ে চেয়ে দেখছি কিছু মুখের সমালোচনা এখন একেবারেই বন্ধ। তুহিন মালিক থেকে শুরু করে ইসলাম প্রেমী গোলাম মাওলা রনী। আর আশেপাশের সকল জামায়াত-শিবির সমর্থক। তারাও দ্বিধায় পড়েছেন এখন। বেনামাজি খালেদা জিয়া ভালো নাকি, এই যে মাঝে মাঝে হিজাব পরিহিত, কওমীর স্বীকৃতিদানকারী, মূর্তিপূজার বিরোধী বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভালো! আর কিছু মানুষ আবার নতুন করে যুদ্ধে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে। কার বিরুদ্ধে কার যুদ্ধ হবে সেটা নির্ধারন করা গেলেই কেবল ভিন্ন সমীকরনটি সামনে আসবে। আপাতত আওয়ামী-হেফাজতের দিন মেনে নেই।

নিউইয়র্ক, ২৫ এপ্রিল ২০১৭

One thought on “বিএনপি-জামায়াত, আওয়ামী-হেফাজত?

Leave a Reply

%d bloggers like this: